অটিজম ও সংবেদনশীলতার সমস্যা: অতিরিক্ত শব্দ, আলো বা স্পর্শে শিশুর ভীতি ও অস্বস্তি দূর করার উপায়

👁 ৪১২ বার পড়া হয়েছে

ব্লেন্ডার মেশিনের শব্দ, প্রেশার কুকারের সিটি কিংবা ঘরের কড়া বাতির আলো—সাধারণ মানুষের কাছে যা একদম স্বাভাবিক, অটিস্টিক শিশুর কাছে তা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও ভীতিপ্রদ মনে হতে পারে। হঠাৎ তীব্র শব্দ শুনলে দুই হাত দিয়ে কান চেপে চিৎকার করা, নতুন পোশাকের ট্যাগে চুলকানি ও অস্বস্তি বোধ করা, কিংবা উজ্জ্বল আলো দেখলেই চোখ বন্ধ করে ফেলার মতো ঘটনা অটিজম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়। চিকিৎসার ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ইন্দ্রিয়গত অনুভূতির অতি-সংবেদনশীলতা বা সংবেদনশীল স্নায়ুর অতিরিক্ত চাপ।

শিশুর এই আচরণ কোনো সাধারণ জেদ বা দুষ্টুমি নয়; বরং এটি তার সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রের এক বিশেষ অস্বস্তি। সঠিক চিকিৎসা ও ঘরোয়া অনুকূল পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে শিশুকে এই তীব্র অস্বস্তি থেকে সম্পূর্ণ শান্ত ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।


পরিবেশের শব্দ ও আলোতে শিশুর অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কেন হয়?

আমাদের মস্তিষ্ক পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের (দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ ও স্পর্শ) মাধ্যমে চারপাশের অনুভূতি গ্রহণ করে। কিন্তু অটিজম বৈশিষ্ট্যযুক্ত শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিবেশের এই অনুভূতিগুলো সঠিকভাবে সামলে নিতে পারে না। ফলে চারপাশের অতিরিক্ত শব্দ বা আলোর চাপ মস্তিষ্ক একসাথে সামলাতে না পেরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

  • শব্দ ও আলোর প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা: সাধারণ শব্দ বা আলোকে শিশুর মস্তিষ্ক বহুগুণ তীব্র হিসেবে অনুভব করে। ফলে শিশু আতঙ্কে কান চেপে ধরে বা চোখ ঢেকে ফেলে।
  • অনুভূতির অতিরিক্ত চাহিদা বা বারবার চঞ্চলতা: কোনো কোনো শিশু শরীরের ভেতর পর্যাপ্ত অনুভূতি না পেয়ে অতিরিক্ত সংবেদন পাওয়ার জন্য নিজের শরীর ঝাঁকায়, গোল হয়ে ঘোরে বা হাত নাড়িয়ে অস্থিরতা প্রকাশ করে।
  • অপ্রয়োজনীয় শব্দ মস্তিষ্ক থেকে বাদ দিতে না পারা: মস্তিষ্কের স্নায়বিক ভারসাম্য শিথিল থাকায় বাইরের অপ্রয়োজনীয় আওয়াজ বা দৃশ্য শিশু মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করতে পারে না।

ইন্দ্রিয়গত অতি-সংবেদনশীলতার প্রধান ৪টি লক্ষণ

অটিস্টিক শিশুর মধ্যে এই সংবেদনশীলতার সমস্যা সাধারণত নিচের ৪টি ইন্দ্রিয়গত লক্ষণে প্রকাশ পায়:

  1. শ্রবণগত ভয় ও শব্দভীতি: ব্লেন্ডার মেশিন, প্রেশার কুকার, আতশবাজি বা বাচ্চার কান্নার মতো শব্দ শুনলে হঠাৎ দুই হাত দিয়ে শক্ত করে কান চেপে ধরা এবং ভয়ে কান্নাকাটি করা।
  2. দৃষ্টির অস্বস্তি ও আলোভীতি: কড়া রোদ, উজ্জ্বল টিউবলাইট বা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সহ্য করতে না পারা এবং চোখ পিটপিট করে চোখ ঢেকে রাখা। এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক চোখে চোখ রেখে তাকানোর সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়।
  3. ত্বক ও স্পর্শের অস্বস্তি: নির্দিষ্ট কাপড়ের বুনন, জামার কলারের ট্যাগ, জুতো-মোজা বা ভেজা জামা গায়ে রাখতে না চাওয়া এবং কাউকে স্পর্শ বা জড়িয়ে ধরতে না দেওয়া।
  4. খাবারের স্বাদ ও গন্ধের অস্বস্তি: নির্দিষ্ট কোনো শক্ত, পিচ্ছিল বা আঁশযুক্ত খাবার মুখে দিলেই বমি ভাব হওয়া, যা শিশুর জন্য সুষম পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা বজায় রাখতে বড় বাধা তৈরি করে।

শিশুর সংবেদনশীল অস্বস্তি কমাতে মা-বাবার করণীয় ও বর্জনীয়

যা করবেন (সঠিক গাইডলাইন)যা কখনোই করবেন না (মারাত্মক ভুল)
১. শান্ত ও মৃদু আলোর পরিবেশ: ঘরে অতিরিক্ত কড়া আলো কমিয়ে নরম বাতি এবং শব্দহীন শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন।১. জোর করে সহ্য করানোর চেষ্টা: “অভ্যাস হয়ে যাবে” ভেবে শিশুকে তীব্র শব্দ বা ভীড়ের মধ্যে জোর করে আটকে রাখা মারাত্মক ক্ষতি করে।
২. নরম ইয়ার-মাফ ব্যবহার: বাইরে বের হলে বা শব্দবহুল অনুষ্ঠানে শিশুকে নরম হেডকভার বা ইয়ার-মাফ পরিয়ে দিন।২. কান থেকে হাত ছাড়িয়ে নেওয়া: ভয়ের মুহূর্তে জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিলে শিশু মারাত্মক অতিরিক্ত রাগ ও কান্নাকাটি করতে পারে।
৩. নরম সুতি পোশাক ও আরামদায়ক বিছানা: পোশাকের ট্যাগ কেটে ১০০% সুতি নরম জামা পরাবেন। রাতে আরামদায়ক নরম বিছানা ও কম্বল দিন, যা শিশুর রাতের গভীর ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করে।৩. বকাঝকা ও ভয়ের উপহাস: শিশুকে ভীতু বলে লজ্জা দেওয়া বা শাস্তির ভয় দেখালে স্নায়ুর অস্থিরতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
৪. স্নেহের স্পর্শ ও শান্ত খেলাধুলা: শিশুকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরা, হাত-পায়ে আলতো মালিশ করা এবং নরম বল নিয়ে খেলা করানো।৪. শান্ত রাখতে মোবাইল স্ক্রিন ধরিয়ে দেওয়া: মোবাইলের দ্রুতগতির আলো শিশুর সংবেদনশীল স্নায়ুকে আরও বেশি উত্তেজিত করে তোলে।

👨‍⚕️ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বৈজ্ঞানিক সমাধান ও নিরাময়

“শব্দ, আলো বা স্পর্শে শিশুর তীব্র অস্বস্তি কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং এটি তার মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীলতার এক স্বাভাবিক ভারসাম্যহীনতা। সঠিক ও নিরাপদ ক্লাসিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে স্নায়ুর এই অতিরিক্ত অস্থিরতা দূর করে দীর্ঘস্থায়ী প্রশান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ফলে শিশু প্রাকৃতিকভাবেই চারপাশের শব্দ, আলো ও স্পর্শকে শান্ত মনে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে।”

— ডাঃ এম এ হক
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান গবেষক, Autism Treatment & Research Centre



চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শ বা অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য:
ভিজিট করুন আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেজ অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন যোগাযোগ পেজ-এ।

ডাঃ এম এ হক

Leave Your Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *