অটিস্টিক শিশুর চোখের দিকে না তাকানো (Eye Contact না থাকা): কারণ ও স্বাভাবিক বিকাশের সমাধান

👁 ৫৪১ বার পড়া হয়েছে

অটিজম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবারা যে বিষয়টি সবচেয়ে আগে ও গভীরভাবে লক্ষ্য করেন, তা হলো—শিশু মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে চায় না বা চোখে চোখ রাখা (Eye Contact) এড়িয়ে চলে। কথা বলার সময়, কোনো কিছু চাওয়ার সময় কিংবা আদর করার সময়ও শিশুটি দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়। এটি ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুর অটিজমের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনেক অভিভাবক ভাবেন শিশুটি হয়তো অবহেলা করছে বা ইচ্ছা করেই তাকাচ্ছে না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা বলছে, এটি কোনো ইচ্ছা বা জেদ নয়—বরং শিশুর মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়ার একটি গভীর স্নায়বিক কারণ রয়েছে।


অটিস্টিক শিশু কেন চোখে চোখ (Eye Contact) রাখতে পারে না?

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নিউরো-সাইকোলজির গবেষণায় শিশুর চোখে চোখ না রাখার পেছনের ৩টি প্রধান কারণ উঠে এসেছে:

  1. ইন্দ্রিয়গত অতিরিক্ত চাপ ও স্নায়বিক সংবেদনশীলতা: মানুষের মুখমণ্ডল অত্যন্ত গতিশীল—তাতে চোখ, ভ্রু, ঠোঁটের নড়াচড়া ও নানা ধরণের আবেগ একসাথে প্রকাশ পায়। সাধারণ শিশুর মস্তিষ্ক এটি সহজে মানিয়ে নিলেও অটিস্টিক শিশুর সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রে এটি তীব্র উদ্দীপনা ও অস্বস্তি তৈরি করে। ফলে শিশু নিজেকে শান্ত ও চাপমুক্ত রাখতে চোখের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বিস্তারিত জানতে পড়ুন ইন্দ্রিয়গত অনুভূতির অতি-সংবেদনশীলতা গাইড।
  2. সামাজিক অস্বস্তি ও দ্বিধাবোধ: সরাসরি দৃষ্টি সংযোগ তৈরি হলে শিশু ভেতর থেকে এক ধরণের জড়তা ও সামাজিক চাপ অনুভব করে।
  3. স্ক্রিন আসক্তির প্রভাব: মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেক সময় ভার্চুয়াল অটিজমের শিকার শিশুরা বাস্তবের মানুষের মুখের অভিব্যক্তির চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনের আলোতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

ঘরে বসে অটিস্টিক শিশুর আই কন্টাক্ট বাড়ানোর ৫টি জাদুকরী ও বৈজ্ঞানিক কৌশল

কৌশলকীভাবে করাবেনকেন এটি কার্যকর
১. চোখের সমান্তরালে (Eye Level) বসাবাচ্চার উপর দাঁড়িয়ে কথা না বলে নিচে বসে বা কোলে নিয়ে ঠিক বাচ্চার চোখের উচ্চতায় এসে কথা বলুন।বাচ্চা নিরাপদ বোধ করে এবং তাকানো সহজ হয়।
২. প্রিয় বস্তু চোখের কাছে ধরাবাচ্চা যে খেলনা বা খাবারটি চাইছে, তা সরাসরি তার হাতে না দিয়ে নিজের চোখের একদম কাছাকাছি তুলে ধরুন।খেলনার দিকে তাকাতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই দৃষ্টি মুখের দিকে পড়ে।
৩. সাবানের বাবল ও লুকোচুরি খেলামুখের কাছে সাবানের রঙিন ফেনা (Bubble) ফুঁ দিয়ে ওড়ান অথবা ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে লুকোচুরি খেলুন।খেলাধুলার আনন্দে বাচ্চার মনোযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চোখের দিকে আকর্ষিত হয়।
৪. জোর করে তাকানোর চাপ না দেওয়া“আমার চোখের দিকে তাকাও” বলে বাচ্চার মুখ জোর করে ঘুরিয়ে ধরবেন না। এতে শিশু আরও ভয় পায়।সহানুভূতিশীল পরিবেশ শিশুকে ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলে।
৫. তাকানো মাত্রই উৎসাহিত করাশিশু এক মুহূর্তের জন্যও চোখে তাকালে সাথে সাথে মুখে হাসি ও আদর দিয়ে উৎসাহিত করুন।বাচ্চা বুঝতে পারে চোখে তাকালে মা-বাবা আনন্দ পান।

কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি?

চোখের দিকে না তাকানোর পাশাপাশি যদি শিশু নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়, দেরিতে কথা বলা কিংবা সমবয়সীদের সাথে না মেশার সমস্যা থাকে—তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো শুরু করা সঠিক নিরাপদ চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর দৃষ্টি সংযোগ ও ভাষা বিকাশ দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব।


👨‍⚕️ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ

“আই কন্টাক্ট বা চোখে চোখ রাখা হলো মানুষের সাথে সামাজিক যোগাযোগের প্রথম সেতু। জোরজবরদস্তি না করে প্রতিদিনের খেলাধুলা ও স্নেহের মাধ্যমে শিশুর সাথে চোখে চোখ রাখার অভ্যাস তৈরি করুন। সঠিক ও নিয়মিত পরিচর্যায় প্রতিটি শিশুই উন্নতি করতে সক্ষম।”

— ডাঃ এম এ হক
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান গবেষক, Autism Treatment & Research Centre


About Author:

ডাঃ এম এ হক

Leave Your Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *