গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন যেসব অসচেতনতায় শিশুর অটিজমের ঝুঁকি বাড়ে: ভবিষ্যৎ মা-বাবাদের করণীয়

👁 ৫৭ বার পড়া হয়েছে

একটি ফুটফুটে সুস্থ ও স্বাভাবিক সন্তানের আগমন প্রতিটি মা-বাবার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন। কিন্তু সন্তান ধীরে ধীরে বড় হওয়ার সাথে সাথে যখন তার চোখাচোখি না করা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, বয়স অনুযায়ী দেরিতে কথা বলা কিংবা একা একা থাকার মতো আচরণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং চিকিৎসকরা জানান শিশুটি অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত—তখন মা-বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। অনেকেই তখন নিদারুণ কষ্টে ভাবতে থাকেন, “আমাদের কোথায় ভুল হয়েছিল? গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময়ে কি এমন কোনো অসচেতনতা হয়েছিল যা আমরা বুঝতে পারিনি?”

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, অটিজম কোনো একক কারণে হয় না; বরং জেনেটিক প্রবণতার সাথে গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন পরিবেশগত বিষক্রিয়ার এক জটিল মিথস্ক্রিয়া থাকে। বিশেষ করে গর্ভধারণের ৯ মাস এবং প্রসবের মুহূর্তটি শিশুর মস্তিষ্কের কোটি কোটি স্নায়বিক সংযোগ গঠনের স্বর্ণযুগ। এই অতি-সংবেদনশীল সময়ে মায়ের শরীরের ভেতরের পরিবেশ, ভুল ওষুধ সেবন কিংবা প্রসবের জটিলতা শিশুর স্নায়বিক বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

ভবিষ্যৎ ও বর্তমান মা-বাবাদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে আজ আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন কোন কোন ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো শিশুর অটিজমের ঝুঁকি বাড়ায় এবং কীভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়ে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা যায়।


গর্ভাবস্থায় যেসব অসচেতনতা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে

গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রতিটি অনুভূতি, গৃহীত প্রতিটি খাবার, ওষুধ এবং চারপাশের পরিবেশ সরাসরি গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টা বা গর্ভফুলের মাধ্যমে শিশুর রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে। যেসব অসচেতনতা গর্ভস্থ শিশুর স্নায়বিক ক্ষতি করতে পারে:

১. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ সেবন

আমাদের সমাজে অনেক গর্ভবতী মা সামান্য সর্দি, জ্বর, মাথাব্যথা বা গ্যাসের জন্য নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল, পেইনকিলার কিংবা কড়া অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেয়ে ফেলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ঘন ঘন পেইনকিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করলে গর্ভস্থ শিশুর হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া চিকিৎসকের বিশেষ তত্ত্বাবধান ছাড়া মৃগীরোগের ওষুধ বা বিষণ্ণতার কড়া ওষুধ সেবনে শিশুর অটিজমের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

২. ভারী ধাতু ও রাসায়নিক বিষক্রিয়া (Lead, Mercury, BPA)

আধুনিক জীবনযাত্রায় গর্ভবতী মায়েরা অজান্তেই নানা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন। যেমন—ফরমালিন ও কীটনাশকযুক্ত খাবার, ভেজাল প্রসাধনী, প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার খাওয়া এবং দূষিত বায়ু। সিসা (Lead) ও পারদ (Mercury)-এর মতো ভারী ধাতু সরাসরি মায়ের রক্ত ভেদ করে শিশুর অপরিণত মস্তিষ্কে প্রবেশ করে নিউরন ধ্বংস করে দিতে পারে।

৩. মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও ইনফেকশন

গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তে সুগার বা ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ভ্রূণের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ (Inflammation) তৈরি হয়। এছাড়া মায়ের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি থাকলে শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে মায়ের তীব্র কোনো ভাইরাল ইনফেকশন বা উচ্চমাত্রার জ্বর হলে মায়ের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ভ্রূণের মস্তিষ্কের কোষে আঘাত হানে।

৪. তীব্র মানসিক চাপ, ভয় ও পারিবারিক অশান্তি

গর্ভাবস্থায় মা যদি দীর্ঘমেয়াদে পারিবারিক কলহ, তীব্র বিষণ্ণতা, ভয় বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে মায়ের রক্তে কর্টিসল (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোন অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায়। এই ক্ষতিকর হরমোন শিশুর মস্তিষ্কের ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী কেন্দ্র ‘অ্যামিগডালা’-র গঠন দুর্বল করে দেয়। এর ফলেই অনেক শিশু বড় হয়ে নতুন পরিবেশে চরম ভয় ও অতিরিক্ত কান্না কিংবা মারমুখী আচরণ প্রকাশ করে।

৫. প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিনের মারাত্মক ঘাটতি

মস্তিষ্কের সঠিক গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন ডি, আয়রন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড অপরিহার্য। গর্ভাবস্থায় সূর্যের মিষ্টি রোদ থেকে বঞ্চিত থাকা এবং ভিটামিন ডি-এর তীব্র ঘাটতি অটিজমের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক গবেষণায় চিহ্নিত হয়েছে।


প্রসবকালীন যেসব জটিলতা শিশুর স্নায়বিক ক্ষতির কারণ হতে পারে

গর্ভকালীন পুরো সময় ভালো থাকলেও প্রসবের সেই নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টার জটিলতা শিশুর সারা জীবনের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে:

১. জন্মের পরপরই অক্সিজেনের অভাব ও দেরিতে কান্না (Birth Asphyxia)

নবজাতক জন্ম নেওয়ার সাথে সাথেই ফুসফুস দিয়ে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়া ও উচ্চৈঃস্বরে কান্না করা আবশ্যক। কোনো কারণে যদি প্রসবের সময় গর্ভফুলের নাড়ি পেঁচিয়ে যায় কিংবা শিশু জন্ম নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট কাঁদতে না পারে, তবে মস্তিষ্কে সাময়িক অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় (Hypoxia)। মাত্র ২-৩ মিনিটের অক্সিজেন স্বল্পতা মস্তিষ্কের সংবেদনশীল স্নায়ুকোষগুলোর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে, যা পরবর্তীতে কথা দেরিতে বলা ও অটিজমের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২. দীর্ঘস্থায়ী ও কষ্টকর প্রসববেদনা (Prolonged Labor)

অদক্ষ দাইয়ের মাধ্যমে বাড়িতে দীর্ঘ ১৮-২৪ ঘণ্টা প্রসববেদনা সহ্য করার কারণে শিশুর মাথা জরায়ুর মুখে আটকে থাকে। এতে মাথায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।

৩. প্রিম্যাচিউর জন্ম ও মারাত্মক নবজাতক জন্ডিস

৩৭ সপ্তাহের পূর্বে জন্ম নেওয়া প্রিম্যাচিউর শিশু এবং জন্মের সময় অতিরিক্ত কম ওজনের শিশুদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি পরিপক্ব থাকে না। এছাড়া জন্মের পর বিলিরুবিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গেলে তা রক্ত ভেদ করে মস্তিষ্কে জমা হয়ে স্নায়ুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।


সুস্থ শিশুর জন্ম নিশ্চিতে ভবিষ্যৎ মা-বাবাদের ১০টি সোনালী নিয়ম

  • পরিকল্পিত গর্ভধারণ: সন্তান নেওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে থেকেই মা ও বাবা উভয়ের সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করুন।
  • নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বন্ধ রাখা: গর্ভাবস্থায় সামান্য গ্যাসের সমস্যা বা জ্বরেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।
  • নিয়মিত অ্যান্টিনেটাল চেকআপ: প্রতি মাসে রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও থাইরয়েড নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
  • বিষমুক্ত পুষ্টিকর খাবার: তাজা শাকসবজি, ডিম, দুধ, ছোট মাছ ও বাদাম খান; প্যাকেটজাত ও কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত খাবার সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলুন।
  • প্রতিদিন রোদে হাঁটা: সকালের মিষ্টি রোদে ১৫-২০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করে প্রাকৃতিক ভিটামিন ডি নিশ্চিত করুন।
  • প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল বর্জন: কাঁচের পাত্রে পানি ও খাবার সংরক্ষণ করুন এবং রাসায়নিক প্রসাধনী থেকে দূরে থাকুন।
  • পারিবারিক প্রশান্তি: গর্ভবতী মাকে সবসময় হাসিখুশি ও শঙ্কামুক্ত পারিবারিক পরিবেশ উপহার দিন।
  • নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব: দক্ষ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU) সম্বলিত হাসপাতালে ডেলিভারি করান।
  • প্রসবের পরপরই কান্না নিশ্চিত করা: শিশু জন্মের সাথে সাথে না কাঁদলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসক দিয়ে অক্সিজেন ও শ্বাসনালী পরিষ্কারের ব্যবস্থা নিন।
  • সচেতন পর্যবেক্ষণ: জন্মের পর শিশুর বিকাশ, চোখের দিকে তাকানো ও প্রাথমিক লক্ষণগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।

  • শিশু ইতোমধ্যে অটিজমে আক্রান্ত হলে করণীয় ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

    যদি প্রসবকালীন বা গর্ভকালীন জটিলতার কারণে আপনার সন্তান ইতোমধ্যে অটিজম, ADHD ও মনোযোগের ঘাটতি, ইকোলালিয়া বা একই কথা বারবার বলা কিংবা হাতে লেখার দুর্বলতায় ভোগে, তবে ভেঙে পড়বেন না। শৈশবে মানব মস্তিষ্কের রয়েছে বিস্ময়কর নিউরোপ্লাস্টিসিটি ক্ষমতা—যার মাধ্যমে সঠিক ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় মস্তিষ্কের বিকল্প পথ তৈরি করে শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

    আমাদের সেন্টারে কোনোপ্রকার কড়া ঘুমের ওষুধ বা সিডেটিভ ছাড়াই লক্ষণভিত্তিক ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুকোষের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করা হয় এবং স্নায়বিক অতি-সংবেদনশীলতা স্থায়ীভাবে দূর করা হয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রক্রিয়া ও সময়কাল সংক্রান্ত নির্দেশিকা পড়ুন।


    শেষ কথা

    গর্ভাবস্থা এবং প্রসবের সময় আমাদের একটু সচেতনতা ও সাবধানতা যেমন একটি শিশুকে আজীবন সুস্থ জীবন উপহার দিতে পারে, তেমনি কোনো কারণে শিশু অটিজমে আক্রান্ত হলেও সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে শিশুকে পুরোপুরি স্বাভাবিক সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আপনার সন্তানের স্বাস্থ্য ও বিকাশ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


    অটিজম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট

    আপনার শিশুর অটিজম, দেরিতে কথা বলা, বিকাশজনিত সমস্যা বা গর্ভকালীন জটিলতাজনিত লক্ষণ সম্পর্কে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে এবং নিরাপদ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য সরাসরি যোগাযোগ করুন:

    📞 হটলাইন ও হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭০৭-০৭৩১৪১

    ডাঃ এম এ হক

    Leave Your Comments

    Your email address will not be published. Required fields are marked *