অটিস্টিক শিশুর চোখের দিকে না তাকানো (Eye Contact না থাকা): কারণ ও স্বাভাবিক বিকাশের সমাধান

আপনার শিশু কি নাম ধরে ডাকলে বা কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকায় না? বাবা-মায়েরা প্রায়ই এই একটি লক্ষণ দেখেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, কারণ “চোখে চোখ না রাখা” (Eye Contact না থাকা)-কে সাধারণত অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD)-এর একটি প্রধান লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এই আচরণের পেছনের প্রকৃত কারণ কী, আর অভিভাবক হিসেবে আপনি কীভাবে শিশুর স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশে সহায়তা করতে পারেন — আজকের লেখায় আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের আলোকে বিষয়টি সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করব।

চোখে চোখ রাখা কেন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়

শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে চোখে চোখ রাখা “যৌথ মনোযোগ” (Joint Attention) তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম — এর মাধ্যমে শিশু অন্যের আবেগ বোঝা, ভাষা শেখা এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা অর্জন করে। এই কারণেই চিকিৎসকেরা শৈশবে চোখে চোখ না রাখাকে অটিজমের একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন।

শিশু কেন চোখে চোখ রাখতে চায় না — গবেষণা কী বলছে

দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক যোগাযোগে অনাগ্রহী বলেই চোখে চোখ রাখে না। কিন্তু হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল-সংশ্লিষ্ট মার্টিনোস সেন্টারের গবেষক ড. নুশিন হাজিখানি-র নেতৃত্বে পরিচালিত এফএমআরআই (fMRI) গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অটিস্টিক ব্যক্তিদের যখন জোর করে অন্যের চোখের দিকে তাকাতে বলা হয়, তখন তাদের মস্তিষ্কের সাবকর্টিক্যাল অংশ — বিশেষত অ্যামিগডালা (মস্তিষ্কের যে অংশ ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) — অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ড. হাজিখানির ভাষায়, এটি সামাজিক অনীহা নয়, বরং মস্তিষ্কের একধরনের “অতি-উত্তেজনা” (Overarousal) কমানোর একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। অনেক অটিস্টিক ব্যক্তি বলেন, সরাসরি চোখে চোখ রাখাটা তাদের কাছে রীতিমতো “পুড়ে যাওয়ার” মতো অস্বস্তিকর অনুভূত হয়।

চোখে চোখ না রাখা কি সবসময় অটিজমের নির্দিষ্ট লক্ষণ?

২০২৫ সালে চীনের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে — খেলার সময় অটিস্টিক ও সাধারণ, উভয় ধরনের শিশুই তাদের সময়ের বড় অংশ (৬০-৮০%) খেলনার দিকে তাকিয়ে কাটায়, আর মানুষের মুখের দিকে তাকায় মাত্র ৬-১৪% সময়। গবেষকদের মতে, দুই দলের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তা অনেকের ধারণার চেয়ে কম উল্লেখযোগ্য, এবং শুধু চোখে চোখ রাখা দিয়েই বিচার না করে হাতের ইশারা বা শরীরী ভাষার মতো অন্যান্য যোগাযোগ সংকেতের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্য অটিজম ও ADHD-এর মধ্যে পার্থক্য বোঝার প্রয়োজনও তৈরি করে।

জোর করে চোখে চোখ রাখানোর ঝুঁকি

যেহেতু গবেষণা বলছে চোখে চোখ রাখা অনেক অটিস্টিক শিশুর জন্য স্নায়বিকভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে, তাই শিশুকে জোর করে বা বকাঝকা করে চোখে চোখ রাখতে বাধ্য করা তার মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করতে পারে।

স্বাভাবিক বিকাশে সহায়ক কিছু কার্যকর পদক্ষেপ

  • জোর না করে ধৈর্য ধরুন: চোখে চোখ রাখতে চাপ না দিয়ে, শিশুর নিজের গতিতে স্বাভাবিকভাবে অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ দিন।
  • খেলার মাধ্যমে যৌথ মনোযোগ তৈরি করুন: শিশুর পছন্দের খেলনা বা জিনিস নিজের চোখের কাছাকাছি ধরে খেলুন, যাতে খেলনা দেখার পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই আপনার মুখের দিকেও দৃষ্টি যায়।
  • আশেপাশের পরিবেশ শান্ত রাখুন: বেশি শব্দ বা জোরালো আলো কমিয়ে একটি শান্ত ও আরামদায়ক জায়গায় শিশুর সাথে কথা বলার চেষ্টা করুন।
  • শুধু চোখে নয়, অন্য সংকেতেও মনোযোগ দিন: হাতের ইশারা, মুখভঙ্গি বা শরীরী ভাষার মাধ্যমে শিশু যোগাযোগ করছে কিনা, সেদিকেও লক্ষ রাখুন।
  • ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিন, চাপ নয়: শিশু নিজে থেকে চোখে চোখ রাখলে হাসিমুখে ইতিবাচক সাড়া দিন, কিন্তু না রাখলে তিরস্কার করবেন না।

প্রতিদিনের রুটিনে এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো কীভাবে সহজে অন্তর্ভুক্ত করবেন, তা বিস্তারিত জানতে দেখুন আমাদের অটিজম শিশুর দৈনন্দিন রুটিন ও যত্ন সংক্রান্ত সম্পূর্ণ গাইড।

কখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

চোখে চোখ না রাখা একা কোনো নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় নয় — এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তাই এই লক্ষণের পাশাপাশি শিশুর সার্বিক আচরণ, ভাষা বিকাশ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি শিশুর পরিস্থিতি আলাদা বলে আমরা নিজে থেকে কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত এখানে বলছি না — সন্তানের ক্ষেত্রে ঠিক কী প্রয়োজন, তা সরাসরি মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে ডাঃ এম এ হকের (Dr. M A Haque) সঙ্গে পরামর্শ করার পরামর্শ দিচ্ছি। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তই এক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

চিকিৎসাগত দিক থেকে হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতি অটিজম শিশুর বিকাশে কীভাবে সহায়ক হতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন: হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কীভাবে অটিজম শিশুদের বিকাশে সহায়ক হতে পারে

উপসংহার

শিশু চোখে চোখ না রাখলে সেটিকে একগুঁয়েমি বা অনাগ্রহ না ভেবে, বরং তার মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বোঝার চেষ্টা করুন। জোর না করে, ধৈর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে শিশুর পাশে থাকাই তার স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে বড় সহায়ক। আপনার সন্তানের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত জানতে ও সঠিক পরামর্শ পেতে এখানে ক্লিক করে ডাঃ এম এ হকের কাছে প্রশ্ন জমা দিতে পারেন।

About Author:

ডাঃ এম এ হক

Leave Your Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *