অটিজম কী, লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা: অটিজম সম্পর্কে সাধারণ জিজ্ঞাসা
অটিজম নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন ও কৌতূহল রয়েছে। অনলাইনে মানুষ নিয়মিত সার্চ করেন “অটিজম কী”, “বাচ্চাদের অটিজমের লক্ষণ কী কী”, “অটিজম কি পুরোপুরি ভালো হয়” ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। নিচে এই সম্পর্কিত মানুষের সাধারণ জিজ্ঞাসা এবং তার বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) কী?
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে ASD এক ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টাল বা মনোবিকাশের সমস্যা। এই সমস্যার কারণে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং পরিপূর্ণ মানসিক বৃদ্ধি ঘটে না। এটি শিশুর সামাজিক সম্পর্ক, আচরণ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
অনেকে জানতে চান, অটিজম কি কোনো রোগ? এটি মূলত কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটি একটি “নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার” বা ব্যাধি। তবে ব্যাধি কেও রোগ বলা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর মস্তিষ্কের নিউরনসমূহ সঠিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে না পারায় এই সমস্যা ঘটে। অটিজমের তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়, যাকে “স্পেকট্রাম” বলা হয়। কেউ সব সময় আত্মমগ্ন থাকে, কারো বন্ধু থাকে না, আবার কেউ কথা বলতে পারে না বা দেরিতে কথা বলে (Speech delay)।
২. বাচ্চাদের অটিজমের লক্ষণ কী কী? (Autism symptoms in children)
শিশুর অটিজম আছে কি না কীভাবে বুঝবেন, তা নিয়ে বাবা-মায়েরা খুব চিন্তিত থাকেন। অটিজমের প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- সামাজিক যোগাযোগের অভাব: বাচ্চা চোখে চোখ রেখে কথা না বলার কারণ (আই-কন্টাক্ট না করা) অনেক সময় অটিজম হতে পারে। এছাড়া, ডাকে সাড়া না দেওয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে না পারা এর অন্যতম লক্ষণ।
- আত্মমগ্নতা: সব সময় নিজের তৈরি জগতে আপন মনে থাকতে পছন্দ করা, কারো দিকে তাকিয়ে না হাসা বা আদর করলেও সাড়া না দেওয়া।
- পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ: একই কথা বারবার বলা (Echolalia) এবং একই কাজ বা আচরণ বারবার করতে পছন্দ করা।
- আচরণগত তীব্রতা বা হাইপার-অ্যাক্টিভিটি (Hyperactive): অতি চঞ্চলতা, অতিরিক্ত ভীতি, মনোযোগের সমস্যা, ঘন ঘন মনের অবস্থা পরিবর্তন হওয়া এবং ঘুমের সমস্যা।
- ধ্বংসাত্মক আচরণ: অনেকে নিজের হাত কামড়ে রক্তাক্ত করে, হাতের কাছের জিনিসপত্র ভেঙে নষ্ট করে, বা দরজায় জোরে জোরে শব্দ করে।
ডাঃ এম এ হক সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন
৩. কত বছর বয়সে অটিজম বোঝা যায়?
শিশুর বয়স একটু একটু করে বাড়ার সাথে সাথে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। সাধারণত জন্মের ৪ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুর আচরণগত পার্থক্য ও মানসিক সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। তাই শিশুদের দেরিতে কথা বলার কারণ ও সমাধান নিয়ে দ্রুত সচেতন হওয়া জরুরি।
৪. অটিজম কেন হয়? এটি কি বংশগত?
অটিজম কেন হয়, তা নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর সার্চ হয়। অটিজম একক কোনো কারণে হয় না। এর ওপর শক্তিশালী জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব আছে।
- জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব: পিতা-মাতার বংশের জেনেটিক পজিটিভ ও নেগেটিভ ফ্যাক্টরসমূহ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মাধ্যমে সন্তানের শরীরে প্রতিস্থাপিত হয়। যে পরিবারে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি অথবা যাদের পরিবারের সদস্যদের অটিজম আছে, তাদের এই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।
- মাতার গর্ভকালীন অবস্থা: গর্ভধারণের সময় মাতার শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিষয়গুলো ভ্রূণের পজিটিভ-নেগেটিভ ফ্যাক্টরকে প্রভাবিত করে। নেগেটিভ ফ্যাক্টর জোরালো থাকলে শিশুর ক্রোমোজোম এবং মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়।
- নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণ: মস্তিষ্কের নিউরনসমূহ সঠিকভাবে তথ্য আদান-প্রদান করতে না পারায় এই সমস্যা ঘটে। মনে রাখবেন, এটি কোনো অপুষ্টিজনিত সমস্যা বা খারাপ লালন-পালনের বিষয় নয়।
৫. অটিজম কি পুরোপুরি ভালো হয়? অটিজমের চিকিৎসা
লক্ষণ ধরা পড়ার পর অভিভাবকরা জানতে চান, অটিজমের চিকিৎসা কী এবং কীভাবে কাজ করে।
- প্রচলিত বা আধুনিক চিকিৎসা ধারণা: প্রচলিতভাবে অনেকে মনে করেন এর কোনো ওষুধ নেই, শুধুমাত্র অটিজম স্কুল ও থেরাপিই এর একমাত্র সমাধান, তবে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
- হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি: হোমিওপ্যাথিতে অটিজম শিশুদের ভালো মানের চিকিৎসা রয়েছে। চিকিৎসার সময় সঠিক তথ্য প্রদান করলে তিন মাসের মধ্যে পরিবর্তন বোঝা যায় এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
৬. অটিজমের সাথে আর কী কী সমস্যা থাকতে পারে?
অটিস্টিকদের ক্ষেত্রে অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক সমস্যা একসাথে থাকা খুবই সাধারণ। যেমন: ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, অন্ধত্ব, বধিরতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, অতি চঞ্চলতা (Hyperactive), অতিরিক্ত ভীতি, মনোযোগের সমস্যা এবং ঘুমের সমস্যা।
অভিভাবকদের এবং পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ পরামর্শ
১. মানসিক প্রস্তুতি ও প্রাথমিক করণীয়
- মাথা ঠান্ডা রেখে শান্তভাবে শিশুর সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে হবে এবং করণীয় সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে।
- অন্যান্য অটিস্টিক শিশুর অভিভাবকদের সাথে পরিচয় থাকলে তাদের সাথে পরামর্শ করে চিকিৎসা, থেরাপি, লেখাপড়া ও খাবারের রুটিন সম্পর্কে তথ্য জেনে নিতে হবে।
- সন্তানের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব অভিভাবককেই গ্রহণ করতে হবে।
- অটিজম সন্তান জন্মের জন্য মাকে এককভাবে দায়ী করা বা তাঁর সাথে অমানবিক আচরণ করা সম্পূর্ণ অনুচিত, কারণ এর পেছনে পিতা-মাতা উভয়ের জেনেটিক ফ্যাক্টর জড়িত থাকে।
২. দৈনন্দিন রুটিন ও আচরণগত পরামর্শ
- শিশুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে সাহায্য করতে হবে।
- ঘরের ও নিজের ছোট ছোট কাজগুলো শিশুদের শিখিয়ে দিতে হবে।
- শিশুর এনার্জি বার্ন হয় এমন কাজ করাতে হবে এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম বা কসরত করাতে হবে।
- শিশুকে সবার থেকে আলাদা রাখা যাবে না, বরং সমবয়সী অন্য শিশুদের সাথে মিশতে ও খেলাধুলা করতে সহায়তা করতে হবে।
- শিশুর যে কাজগুলোতে আগ্রহ থাকে (যেমন: ছবি আঁকা), সেগুলো করতে তাকে সাহায্য করতে হবে।
৩. যোগাযোগ ও কথাবার্তা
- শিশুদের সামনে তাদের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ‘না’ সূচক কথা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
- কথোপকথনের সময় জটিল শব্দ এড়িয়ে সহজ, সাবলীল ও ছোট শব্দ ব্যবহার করে কথা বলতে হবে।
- কোনো বয়সে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা শিশুকে ধীরে ধীরে শেখাতে হবে।
৪. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি
- মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য সঠিক পুষ্টিকর খাদ্য বা বিশেষ ডায়েট অনুসরণ করতে হবে।
- চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে বা খুব কম মাত্রায় দিতে হবে।
- চা, কফি বা চকলেটের মতো ক্যাফেইন জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।
- গম, দুধ বা এজাতীয় জিনিস দ্বারা তৈরি খাবার অনেক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তাই স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করতে হবে।
৫. ঘুমের সমস্যা সমাধানে করণীয়
- ঘুম পাড়ানোর অন্তত ১-২ ঘণ্টা আগে টেলিভিশন, কম্পিউটার বা মোবাইল বন্ধ করে দিতে হবে।
- ঘুমের আগে খুব বেশি হইহুল্লোড় বা উত্তেজিত ধরনের খেলাধুলা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ঘুমানোর আগে ড্রয়িং করা, বইয়ের ছবি দেখানো বা পাজল মেলানোর মতো নীরব কাজ করানো যেতে পারে।
- প্রেশার টাচ (সহনীয় ও আদর মাখানো কায়দায় চেপে বা জড়িয়ে ধরা), পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া, এবং হালকা মিউজিক শোনানো শিশুর ঘুমের জন্য বেশ সহায়ক।
- ঘুম পাড়ানোর সময় ছন্দ মেলানো কবিতা পড়া বা ছড়া শোনানোও শিশুদের শান্ত করতে সাহায্য করে।
- বাবা-মায়ের উপস্থিতি ছাড়াই শিশুটিকে একা একা ঘুমানোতে অভ্যস্ত করতে হবে।
অটিজম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও চিকিৎসাকেন্দ্র
বাংলাদেশে অটিজম, ADHD ও স্পিচ ডিলের মতো নিউরোডেভেলপমেন্টাল সমস্যার কার্যকর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ড. এম. এ. হক, পিএইচ.ডি. দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা ও সফল চিকিৎসা প্রদান করছেন। আপনার সন্তানের সঠিক বিকাশে পরামর্শ নিতে আজই যোগাযোগ করুন Autism Treatment & Research Centre-এ।
রোগী দেখার সময়সূচি: প্রতি বুধবার থেকে সোমবার, সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। চেম্বার: ডাঃ হক হোমিও ট্রিটমেন্ট এন্ড রিসার্র্স সেন্টার, বিটিআই সেন্ট্রা গ্রান্ড, গ্রাউন্ড ফ্লোর (জি-৪), ১৪৪ গ্রীণ রোড, পান্থপথ, ঢাকা। মোবাইল: 017 07 07 3141
আপনার সন্তানের সঠিক বিকাশে ডাঃ এম. এ. হকের পরামর্শ নিতে, ঘরে বসেই অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন: